বৃষ্টিপাত (Rainfall)

নবম-দশম শ্রেণি (মাধ্যমিক) - ভূগোল ও পরিবেশ - বায়ুমণ্ডল | NCTB BOOK
4.1k
Summary

বৃষ্টিপাত হলো যখন ভাসমান মেঘ ঘনীভূত হয়ে পানির ফোঁটা আকারে মাধ্যাকর্ষণের টানে মাটিতে পড়ে। এটি বৃষ্টিমাপক যন্ত্র দ্বারা পরিমাপ করা হয়। বৃষ্টিপাতের তিনটি প্রধান কারণ হল:

  • বাতাসে জলীয়বাষ্পের উপস্থিতি
  • উপরের দিকে গমন
  • বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতার হ্রাস

বৃষ্টিপাতের শ্রেণীবিভাগ:

  • পরিচলন বৃষ্টি: দিনের বেলা সূর্যের উত্তাপে জলীয়বাষ্প উপরে উঠে এবং শীতল বায়ুর সংস্পর্শে বৃষ্টিতে রূপান্তরিত হয়।
  • শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টি: জলীয়বাষ্পযুক্ত বায়ু উঁচু পর্বতের উপর দিয়ে গেলে উপরে উঠে শীতল হয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়।
  • বায়ুপ্রাচীরজনিত বৃষ্টি: শীতল ও উষ্ণ বায়ুর মিশ্রণে তৈরি বায়ুপ্রাচীরের কারণে বৃষ্টিপাত ঘটে।
  • ঘূর্ণি বৃষ্টি: নিম্নচাপ কেন্দ্রে উষ্ণ ও শীতল বায়ুর মিশ্রণ থেকে বৃষ্টিপাত ঘটে।

বৃষ্টি বিভিন্ন আবহাওয়াগত অবস্থার উপর নির্ভর করে ঘটে, যার ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরনের পার্থক্য দেখা যায়।

স্বাভাবিকভাবে ভাসমান মেঘ ঘনীভূত হয়ে পানির ফোঁটা ফোঁটা আকারে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে ভূপৃষ্ঠে পতিত হলে তাকে বৃষ্টিপাত বলে। এই বৃষ্টিপাত কখনো প্রবল এবং কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি আকারে ভূপৃষ্ঠে পতিত হয়। বৃষ্টিপাত বৃষ্টিমাপক যন্ত্রের (Rain gauge) দ্বারা পরিমাপ করা হয়।


বৃষ্টিপাতের কারণ (Causes of Raifall) : সূর্যের উত্তাপে সৃষ্ট জলীয়বাষ্প উপরের শীতল বায়ুর সংস্পর্শে এলে সহজেই তা পরিবৃত্ত হয়। পরে ঐ পরিপৃক্ত বায়ু অতি ক্ষুদ্র জলকণায় পরিণত হয়ে বায়ুমণ্ডলের ধূলিকণাকে আশ্রয় করে জমাট বেঁধে মেঘের আকারে আকাশে ভাসতে থাকে। বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা কোনো কারণে আরও হ্রাস পেলে ঐ মেঘ ঘনীভূত হয়ে গানিবিন্দুতে অথবা বরফকুচিতে পরিণত হয় এবং মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে তা ভূপৃষ্ঠে নেমে আসে। এভাবে পৃথিবীতে বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। সুতরাং বৃষ্টিপাতের কারণ হলো- (১) বাতাসে জলীয়বাষ্পের উপস্থিতি, (২) ঊর্ধ্ব গমন এবং (৩) বায়ুমণ্ডলের ঊষ্ণতা হ্রাস পাওয়া।


বৃষ্টিপাতের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Rainfall) : জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু যে কারণে উপরে উঠে ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টিপাতে পরিণত হয়। সেই অনুসারে বৃষ্টিপাতের শ্রেণিবিভাজন করা হয়ে থাকে। বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতি অনুসারে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতকে প্রধানত চারটি শ্রেণিতে তাগ করা হয়ে থাকে। যথা— (১) পরিচলন বৃষ্টি, (২) শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টি, (৩) বায়ুপ্রাচীরজনিত বৃষ্টি ও (৪) ঘূর্ণি বৃষ্টি।
(১) পরিচলন বৃষ্টি (Convectional Rain) : দिনের বেলার সূর্যের কিরণে পানি বাষ্পে পরিণত হয়ে সোজা উপরে উঠে যায় এবং শীতল বায়ুর সংস্পর্শে এসে ঐ জলীয়বাষ্প প্রথমে মেঘ ও পরে বৃষ্টিতে পরিণত হরে সোজাসুজি নিচে নেমে আসে। এরূপ বৃষ্টিপাতকে পরিচলন বৃষ্টি বলে। নিরক্ষীয় অঞ্চলে (Equatorial region) স্থলভাগের চেরে জলভাগের বিস্তৃতি বেশি এবং এখানে সূর্যকিরণ সারাবছর লম্বভাবে পড়ে। এ দুটি কারণে এখানকার বায়ুমণ্ডলে সারা জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকে। জীয়বাষ্প হালকা বলে সহজেই তা উপরে উঠে গিয়ে শীতল বায়ুর সংস্পর্শে এসে পরিচলন বৃষ্টিরূপে ঝরে পড়ে। তাই নিরক্ষীয় অঞ্চলে সারাবছর প্রতিদিনই বিকেল অথবা সন্ধ্যার সময় এরূপ বৃষ্টিপাত হয়। নাতিশীতোষ্ণমণ্ডলে গ্রীষ্মকালের শুরুতে পরিচলন বৃষ্টি হয়ে থাকে। এ সময়ে এই অঞ্চলের ভূপৃষ্ঠ যথেষ্ট উত্তপ্ত হলেও উপরের বায়ুমণ্ডল বেশ শীতল থাকে । ফলে ভূপৃষ্ঠের জলাশয়গুলো থেকে পানি বাষ্পে পরিণত হয়ে সোজা উপরে উঠে যায় এবং শীতল বায়ুর সংস্পর্শে এসে পরিচলন বৃষ্টিরূপে গঠিত হয় ।

পরিচলন বৃষ্টি নিম্নলিখিত পর্যায় অনুসরণ করে ঘটে থাকে :
• প্রচন্ড সূর্যকিরণে ভূপৃষ্ঠ দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
ভূপৃষ্ঠের উপরস্থ বায়ু উষ্ণ এবং হালকা হয়ে উপরের দিকে উঠে পরিচলনের সৃষ্টি করে।
• ঊর্ধ্বমুখী বায়ু শুষ্ক ৰূদ্ধ তাপ হ্রাস হারে শীতল হতে থাকে এবং বায়ুতে যথেষ্ট পরিমাণ জলীয়বাষ্পের উপস্থিতিতে
ঘনীভবন হয় । • ঘনীভবনের ফলে মেঘ উপরের দিকে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে ঝড়োপুঞ্জ মেঘের সৃষ্টি করে। এ ধরনের মেঘ থেকে ঝাড়সহ মুষলধারে বৃষ্টি এবং কখনো কখনো শিলাবৃষ্টি ও বজ্রপাত হয়ে থাকে।
(২) শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টি (Orographic Rain) : জঙ্গীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু স্থলভাগের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় যদি পমনপথে কোনো উঁচু পর্বতশ্রেণিতে বাধা পার তাহলে ঐ বায়ু উপরের দিকে উঠে যায়। তখন জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ু ক্রমশ প্রসারিত হয় এবং পর্বতের উঁচু অংশে শীতল ও ঘনীভূত হয়ে পর্বতের প্রতিবাত চালে (Windward slope) বৃষ্টিপাত ঘটায়। এরূপ বৃষ্টিপাতকে শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টি বলে (চিত্র ৫.৪)।
ान
পর্বত অতিক্রম করে ঐ বায়ু যখন পর্বতের অপর পার্শ্বে অর্থাৎ অনুবাত ঢালে (Leeward slope) এসে পৌঁছার তখন জলীয়বাষ্প কমে যায়। এছাড়া নিচে নামার ফলে ঐ বায়ু উষ্ণ ও আরও শুষ্ক হয়। এ দুটো কারণে এখানে বৃষ্টি বিশেষ হয় না। এরূপ প্রায় বৃষ্টিহীন স্থানকে বৃষ্টিচ্ছার অঞ্চল (Rain-shadow region) বলে।

জলীয়বাষ্পপূর্ণ দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু হিমালয়
পর্বতে বাধা পেয়ে আসাতে প্রচুর শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত ঘটায়। কিন্তু তার উত্তর দিকে অবস্থিত:  তিব্বতের মালভূমিকে বৃষ্টিচ্ছার অঞ্চল বলে । বায়ু মুখোমুখি উপস্থিত হলে উষ্ণ বায়ু এবং শীতল বায়ু একে যেখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশ কম।

(৩) বায়ুপ্রাচীরজনিত বৃষ্টি (Frontal Rain) : শীতল ও উষ্ণ  বায়ু মুখোমুখি উপস্থিত হলে উষ্ণ বায়ু এবং শীতল বায়ু একে অপরের সঙ্গে মিশে না গিয়ে তাদের মধ্যবর্তী এলাকায় অদৃশ্য বায়ুপ্রাচীরের (Front) সৃষ্টি করে। বায়ুপ্রাচীর সংলগ্ন এলাকায় শীতল বায়ুর সংস্পর্শে ঊষ্ণ বায়ুর তাপমাত্রা হ্রাস পার ফলে শিশিরাঙ্কের সৃষ্টি হয়। ফলে উভয় বায়ুর সংযোগস্থলে বৃষ্টিপাত ঘটে, একে বায়ুপ্রাচীরজনিত বৃষ্টি বলে । এ প্রকার বৃষ্টিপাত সাধারণত নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে দেখা যায়।

(৪) ঘূর্ণি বৃষ্টি (Cyclonic Rain) : কোনো অঞ্চলে বায়ুমণ্ডলে নিম্নচাপ কেন্দ্রের সৃষ্টি হলে জলভাগের উপর থেকে জলীয়বাষ্পপূর্ণ উষ্ণ এবং স্থলভাগের উপর থেকে শুষ্ক শীতল বায়ু ঐ একই নিম্নচাপ কেন্দ্রের দিকে অনুভূমিকভাবে ছুটে আসে। শীতল বায়ু ভারী বলে উষ্ণ বায়ু শীতল বায়ুর উপর ধীরে ধীরে উঠতে থাকে। জলভাগের উপর থেকে আসা উষ্ণ বায়ুতে প্রচুর জলীয়বাষ্প থাকে। ঐ বায়ু শীতল বায়ুর উপরে উঠলে তার ভিতরে জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টিপাত প্রাচীর ঊষ্ণ বায়ু ঘটায়। এরূপ বৃষ্টিপাতকে ঘূর্ণি বৃষ্টি বলে (চিত্র ৫.৬)। এই বৃষ্টিপাত সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে। মধ্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শীতকালে এরূপ বৃষ্টিপাত হতে দেখা যায় ৷ 

কাজ : বাংলাদেশে কী কী ধরনের বৃষ্টিপাত হয় এবং কেন হয়? তা ব্যাখ্যা কর। এ কাজটি শ্রেণিকক্ষে দলে আলোচনা করে সম্পাদন কর ।

 

Promotion
NEW SATT AI এখন আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

Are you sure to start over?

Loading...